আলু সংশ্লিষ্ট ব্যবসায় বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করলেন ডাচরা

রাষ্ট্রদূতের সাথে মেয়র ওয়ার্ফ ও পটাটো ক্লাস্টারের উদ্যোক্তা মার্টেন ফারব্রুখেন

হল্যান্ডে পড়তি গ্রীষ্মের বৃষ্টিস্নাত সকালে পরিচয় হল হান্না, মিরান্ডা, লিনাতা, ফ্লোভা, সেন্না, রয়াল, ইরো সহ আরও অনেকের সাথে। আর ডায়মন্ড, কানেকশন, ফোরজা রা তো অনেক পুরনো বন্ধু। এরা সবাই আর কেউ নয়, আলুর ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতি; আর তাদের সাথে দেখা হল হল্যান্ডের আলুর শহর এমেলর্ডে তথা বিশ্বের বৃহত্তম আলু মেলা পটেটো ইউরোপে। ১৩ থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭ পর্যন্ত দুই দিনের এই আলু মেলায় অংশ নেয় বিশ্বের নামীদামী যত আলুর উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে মজুদকারী, প্রক্রিয়াকরণ প্রতিষ্ঠান, আমদানীকারক, রপ্তানীকারক, কীটনাশক, গবেষক, প্রযুক্তি প্রদানকারী সহ  ২৭০ টি  প্রতিষ্ঠান। একে বিশ্বের বৃহত্তম আলু সম্মেলন বললেও অত্যুক্তি হবেনা কেননা এখানে আলুর উপর যে কোন তথ্য তো বটেই; রয়েছে প্রদর্শনী মাঠের ব্যবস্থা যেখানে হাতে কলমে দর্শনার্থীদের দেখানো হয় এই ক্ষেত্রে বিভিন্ন পরীক্ষিত আবিষ্কারসমূহ। কৃষিক্ষেত্রে প্রযুক্তির প্রয়োগ দেখাতে প্রদর্শিত হয় নিত্য নতুন কম্পিউটার অ্যাপস, দ্রোনসহ আরও অনেক কিছু। আলুর ব্যবসায়ী তো বটেই কৃষি শিক্ষায় আলু নিয়ে যারা পড়াশোনা বা গবেষণা করছেন এরকম ছাত্র-ছাত্রীও এই মেলায় আসছে দলেবলে। তবে সেখানে কূটনীতিকদের আনাগোনা খুব একটা না থাকলেও আলু উৎপাদনে বিশ্বে সপ্তম দেশ তথা বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এই আলু বিদ্যালয়ের পাঠ গ্রহণের সুযোগ হাতছাড়া করলেননা। সেখানে দেখা হলো বাংলাদেশ থেকে আগত কয়েকজন ব্যবসায়ী প্রতিনিধির সাথেও।

পটাটো ইউরোপ (আলু মেলায়) রাষ্ট্রদূতকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন স্থানীয় মেয়র

আলু উৎপাদনে পরিমাণের দিক থেকে ডাচদের অবস্থান খুব উপরে না হলেও আলুর উপর গবেষণায়, নতুন উচ্চফলনশীল ও বালাই প্রতিরোধক প্রজাতি/বীজ আলু উদ্ভাবন, আলু চাষে প্রযুক্তির ব্যবহার, সহায়ক যন্ত্রপাতি তৈরী ইত্যাদি কাজে ডাচদের ধারেকাছে কেউ নেই। আলুর গূণগত মানে আর প্রতি হেক্টরে আলুর উৎপাদনেও তারা শীর্ষে। বিশ্বের সমস্ত আলু বীজ রপ্তানীর ৭০ভাগই করে হল্যান্ড আর আলু চাষ আর গবেষণার মূল কেন্দ্র হলো এমেলর্ড যা কিনা সমুদ্রগর্ভ থেকে পুনরুদ্ধারকৃত নর্ডউস্টপোল্ডারে অবস্থিত। এখানেই খোলা মাঠে আলু মেলার আয়োজন যেখানে ১৪ সেপ্টেম্বরের প্রতিকূল আবহাওয়ায় সেই নর্ডউস্টপোল্ডারের মেয়র অকে ফন ডার ওয়ার্ফ উষ্ঞ অভ্যর্থনা জানালেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত শেখ মুহম্মদ বেলালকে। হল্যান্ড আলু চাষে হোকনা বিশাল কিছু, বাংলাদেশ যে আলু উৎপাদনের দিক থেকে হল্যান্ডের উপরে। সেদিক থেকে দেখলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে সমীহ না করে উপায় নেই। তবে ডাচরা স্বভাবে বিপটাটো ইউরোপ (আলু মেলায়) রাষ্ট্রদূতকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন স্থানীয় মেয়রনয়ী; মেয়র সাহেব তার ব্যাতিক্রম নন। রাষ্ট্রদূতকে অভ্যর্থনা থেকে শুরু করে মেলার স্টলে ছায়ার মতো অনুসরণ করেছেন তিনি।

মেলায় পটাটো বাংলাদেশ ক্লাস্টারের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো পরিদর্শনে রাষ্ট্রদূত

মেলায় রাষ্ট্রদূতের সফরসঙ্গী হন বাংলাদেশ পটাটো ক্লাস্টারের উদ্যোক্তা মার্টেন। বাংলাদেশে আলু চাষে আধুনিকায়ন, উৎপাদন ও বালাই দমনে প্রযুক্তির ব্যবহার আর সংরক্ষণ ব্যবস্থায় উন্নত কলাকৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে আলু বিপ্লব ঘটাতে পটাটো ক্লাস্টারের গঠনের পরিকল্পনা হল্যান্ডের কিছু প্রতিষ্ঠানের। রাষ্ট্রদূত একে একে বাংলাদেশের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর স্টল পরিদর্শন করেন ও তাদের সাথে মত বিনিময় করেন। আলু সংশ্লিষ্ট প্রায় ২০০ ডাচ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্বকারী ডাচ পটাটো অর্গানাইজেশনের কর্মকর্তা কারস্ট উইনিং বাংলাদেশে এই ক্লাস্টারের কার্যক্রম নিয়ে তার উচ্চাকাঙ্খার কথা রাষ্ট্রদূতকে জানালেন। সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ফারব্রুখেন, তসমা, এগ্রোপ্লান্ট, এইচ.এল.বি, ওমনিভেন্ট, বায়ার সকলকেই অত্যন্ত আশাবাদী শোনালো। তাঁরা জানালেন  বাংলাদেশের সাথে ঘনিষ্ঠ ভাবে কাজ করে প্রতি হেক্টরে আলুর উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করবেন। এছাড়া কি কলাকৌশল প্রয়োগ করলে আলু নষ্ট হওয়ার হার কমে আসে সে বিষয়ে তাঁরা তাদের গবেষণালব্ধ জ্ঞান বাংলাদেশে প্রয়োগের চেষ্টা করবেন। তাদের প্রকল্পটি ইতোমধ্যে ডাচ সরকারের আর্থিক সহযোগিতার অনুমোদন লাভ করেছে বলে জানা গেছে। সাথে নলেজ পার্টনার হিসাবে আছে কৃষির হার্ভার্ড নামে পরিচিত ওয়াখেনিংগেন বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলাদেশের কোন প্রতিষ্ঠান এ প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে চাইলে দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ করতে পারে।

রাষ্ট্রদূতের সম্মানে আয়োজিত মধ্যাহ্নভোজে মেয়র ওয়ার্ফসহ অন্যান্যরা

মেলায় অংশ নিয়েছে এল.সি. প্যাকেজিং যারা আলুসহ অন্যান্য কৃষিজাত পণ্যের প্যাকেজিং সমাধান দিয়ে থাকেন। মেলার অন্যতম স্পনসর ও তারা। এল.সি প্যাকেজিং এর পরিচালক লুকাস লামারস রাষ্ট্রদূতকে জানালেন যে পাট ও পাটজাত পণ্যের সহজলভ্যতার কারণে বাংলাদেশকে তাঁরা বেছে নিয়েছেন তাদের ব্যাবসার অন্যতম কেন্দ্র হিসাবে। সম্প্রতি তাঁরা বাংলাদেশের মুন্সিগন্জের গজারিয়ায় তাদের নতুন কারখানায় বিনিয়োগ করছেন  প্রায় ১০ মিলিয়ন ইউরো। সেখানে কাজ করছে প্রায় ১৮০০ শ্রমিক। এছাড়া রাষ্ট্রদূতের সম্মানে মেলাস্থলে আয়োজিত অনাড়ম্বর মধ্যাহ্নভোজের টেবিলে বেশ কয়েকজন ডাচ বিনিয়োগকারী রাষ্ট্রদূতকে বাংলাদেশে তাদের  বিনিয়োগ করার আগ্রহের কথা জানান। রাষ্ট্রদূতও বাংলাদেশে চলমান ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকান্ড সম্পর্কে তাদের অবহিত করেন এবং ডাচ বিনিয়োগকারীদের সম্ভাব্য সকল প্রকার সহযোগিতা প্রদানের আশ্বাস দেন।

এল.সি. প্যাকেজিং এর স্টলে ডিরেক্টর লুকাস লামারস এর সাথে রাষ্ট্রদূত

পটাটো ইউরোপ মেলাটি হল্যান্ড, বেলজিয়াম, ফ্রান্স ও জার্মানী এর প্রতিটি দেশে চার বছরে একবার ঘুরে আসে। প্রতি বছর সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হয় এই মেলা। প্রদর্শনীতে আগত স্টল ও দর্শনার্থী সকলেই অত্যন্ত আন্তরিক। স্টলের মাঝে যেমন আছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠান দর্শনার্থীরাও এসেছেন দূরদূরান্ত থেকে। সকলের লক্ষ্য একটাই- আলু উৎপাদন/প্রক্রিয়াকরণ/বাজারজাতকরণে সর্বশেষ তথ্যগুলো জানা ও এই সেক্টরের প্রতিষ্ঠান সমূহের সাথে সম্পর্ক নবায়ন করা। সুদূর বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে রাষ্ট্রদূতের লক্ষ্যও এর ব্যতিক্রম ছিলনা। বাংলাদেশ নেদারল্যান্ড দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সেতুবন্ধন হিসেবে আলুও ভূমিকা রাখতে পারে বলে বিশ্বাস করে দূতাবাস।

বাংলাদেশ পটাটো ক্লাস্টারের সদস্য টসকা এর স্টলে রাষ্ট্রদূত

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*