নেদারল্যান্ডে মাতৃভাষার জয়গান

২৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৭, দি হেগ। আজ দি হেগে আন্তর্জাতিক পরিসরে আয়োজিত মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মাতৃভাষার টানে সকল জাতি-বর্ণের মানুষ মিলেমিশে হল একাকার, সমস্বরে গাইল মাতৃভাষার জয়গান। শীতের সকালে প্রতিকূল আবহাওয়ায়ও তিনশত জনের ধারণক্ষমতার হলে তিল ধারনের ঠাঁই ছিলনা। শান্তি ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্রের বার্তা নিয়ে মাতৃভাষা দিবস যেন বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে সুদূর দি হেগে এসে পেল সার্বজনীনতা।

Ambassadors group photo

শহীদমিনারে পুষ্পস্তবক অর্পনের মাধ্যমে ভাষা শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানান নেদারল্যান্ডে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত শেখ মুহম্মদ বেলাল এবং ভারত, মালয়শিয়া, শ্রীলংকা ও থাইল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত এবং অন্যান্য দূতাবাসের প্রতিনিধিবৃন্দ। নেদারল্যান্ড আওয়ামীলীগ ও প্রবাসী বাংলাদেশী সংগঠন সীমানে পেরিয়ে, সোনার বাংলা ও প্রবাসী বাংলাদেশী ও স্থানীয় জনগণও ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় ভাষা শহীদদের। নেদারল্যান্ডের প্রবাসী বাংলাদেশীদের মধ্যে বরাবরের মতোই ছিল ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। তাদের সুবিধার্থেই তাই সাপ্তাহিক ছুটির দিনে এই আয়োজন। প্রবাসী বাংলাদেশী ছাড়াও অনুষ্ঠানে যোগ দেন স্থানীয় ছাত্র-ছাত্রী, পেশাজীবি ও গণমাধ্যম ব্যক্তিবর্গ।

অনুষ্ঠানের প্রথমভাগে ভাষা শহীদের স্মরণে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়। এর পর আলোচনা পর্বে অংশ নেন নেদারল্যান্ডে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত শেখ মুহম্মদ বেলাল, দি হেগের ডেপুটি মেয়র ও রাষ্ট্রদূতবর্গ। রাষ্ট্রদূত বেলাল তাঁর বক্তব্যে জানান যে শান্তি ও ন্যায়বিচারের শহর হিসেবে পরিচিত দি হেগে একটি স্থায়ী শহীদমিনার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন সত্য হতে চলেছে। স্থায়ী শহীদমিনার নির্মাণের উপযুক্ত স্থান বরাদ্দের জন্য দূতাবাসের আবেনদনটি দি হেগের নগর কর্তৃপক্ষের সক্রিয় বিবেচনাধীন রয়েছে বলে তিনি জানান। ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ভাষা আন্দোলনে শহীদদের আত্মত্যাগ থেকে জাতি কিভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়ে রাষ্ট্রদূত বেলাল তার বর্ণনা দেন। রাষ্ট্রদূত বেলাল বাংলাদেশে চলমান ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকান্ডের বর্ণনা দেন এবং বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তায় বাংলাদেশের অবদান অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

Thai Dance

দি হেগের ডেপুটি মেয়র রাবিন বালদেবসিং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষাকে বিশ্বময় ছড়িয়ে দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন। মেয়র বালদেবসিং জানান যে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার দর্শন আর শান্তি ও ন্যায়বিচারের শহর দি হেগের নীতি ও ভিত্তি এক ও অভিন্ন। একারণে দূতাবাসের দি হেগে একটি শহীদ মিনার নির্মাণ প্রস্তাবের সাথে নগর কর্তৃপক্ষ নীতিগতভাবে একমত বলে তিনি ঘোষনা দেন। ভারতের রাষ্ট্রদূতও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষাকে বিশ্ব বাস্তবতায় পরিণত করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবদানের কথা স্মরণ করেন। মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রদূত নাজরি বিন ইউসুফ বিশ্বের সকল মাতৃভাষা সংরক্ষণে একটি প্লাটফরম তৈরীতে বাংলাদেশে ভূমিকার প্রশংসা করেন। শ্রীলংকার রাষ্ট্রদূত ভাষা শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক বৈচিত্র রক্ষায় বাংলাদেশের অবদান স্বীকার করেন।

বাংলাদেশ দূতাবাসের আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আশাতীতভাবে সাড়া মেলে বিভিন্ন দেশের। মাতৃভাষা ও সংস্কৃতির সৌন্দর্যকে সকলের সামনে উপস্থাপন করতে দশটি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা অংশ নেয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। গল্পের ছলে বাংলাদেশের শিশুদের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরার প্রয়াস সকলকে বিশেষভাবে নাড়া দেয়। রঙিন সাজে শ্রীলংকা, নেপাল, থাইল্যান্ডের শিল্পীদের পরিবেশনা সকলের নজর কাড়ে। কবিতা গানে নেদারল্যান্ড, ভারত, মালয়শিয়া, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার ব্যাতিক্রমধর্মী পরিবেশনা সকলের প্রশংসা কুড়ায়। সুর-সংগীতের আনন্দ ধারায় ডেপুটি মেয়র রাবিন বালদেবসিং এর পরিবেশিত বাংলা গান যোগ করে ভিন্ন মাত্রা।

 

আন্তার্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের সার্বজনীনতায় বৃহত্তর পরিসরে ভিন্ন মাত্রায় আয়োজিত অমর একুশের অনুষ্ঠান সময়োপযোগী বলে সকলে মতদেন। অনুষ্ঠান শেষে সকলকে মধ্যাহ্নভোজে আপ্যায়ন করা হয়।

 

এর আগে গত ২১ শে ফেব্রুয়ারী দূতাবাসে মহান শহীদ দিবস পালন করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নরসিংদী-৩ থেকে নির্বাচিত মাননীয় সংসদ সদস্য জনাব মোঃ সিরাজুল ইসলাম মোল্লা ও নেদারল্যান্ড সফররত এআরকে গ্রুপের একটি প্রতিনিধিদল। তাঁদের উপস্থিতিতে ঢাকা থেকে প্রদত্ত বাণী সমূহ পড়ে শোনানো হয়। অতঃপর শহীদ মিনারের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সকলে।